অবশেষে সিরিজ টাইগারদের

প্রথম ম্যাচে ১৩১ রানের সম্বল নিয়েও জিতেছিল বাংলাদেশ। সেটা ছিল নিজেদের সবচেয়ে কম রান করে জেতার রেকর্ড। আজ তৃতীয় টি-টোয়েন্টিতে জিততে হলে সে রেকর্ডটাও ভাঙতে হতো মাহমুদউল্লাহর দলকে। বৃষ্টিতে দেরিতে শুরু হওয়া ম্যাচে যে ১২৭ রানেই গুটিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ!

একের পর এক ইতিহাস গড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টি জিতেই এই ফরমেটে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর স্বাদ পেয়েছিল টাইগাররা।সেই ইতিহাসের পাতায় নতুন রেকর্ড যোগ হয় টানা দ্বিতীয় জয়ে। সামনে ছিল প্রথমবারের মত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যে কোনো ফরমেটে সিরিজ জয়ের হাতছানি। সেই ইতিহাসও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের দল গড়ে ফেলল দুই ম্যাচ হাতে রেখেই। 

শুক্রবার (৬ আগস্ট) মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে ১০ রানে হারিয়ে পাঁচ ম্যাচ টি-টোয়েন্টি সিরিজে টানা তৃতীয় জয় পেয়েছে ঘরের মাঠের বাংলাদেশ। সেটাও আবার যেনতেনভাবে নয়। নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে কম রান ডিফেন্ড করে। অস্ট্রেলিয়ার জয়ের লক্ষ্য ছিল ১২৮ রানের। শ্বাসরুদ্ধকর এক লড়াই গড়িয়েছে শেষ ওভার পর্যন্ত। ওই ওভারে অস্ট্রেলিয়ার দরকার পড়ে ২২ রান। তরুণ মাহেদি হাসান ওভারের প্রথম বলেই ছক্কা হজম করে বসলে শঙ্কা ভর করে টাইগার শিবিরে। তবে পরের দুই বলে মাত্র ১ রান দেন মাহেদি।

চতুর্থ বলটি ইয়র্কার করতে গিয়েই যেন ‌’নো’ দিয়ে বসেন। অস্ট্রেলিয়া ফ্রি-হিট পেলে আবারও দুশ্চিন্তা তৈরি হয় স্বাগতিকদের। তবে মাহেদি সেই সময়ও মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পেরেছেন। শেষ তিন বলে দেন মাত্র ২ রান। বিজয় উল্লাসে মাতে টাইগার শিবির।

অস্ট্রেলিয়াকে এমন চাপে ফেলার অবশ্য বড় কারিগর মোস্তাফিজুর রহমান। শেষ দুই ওভারে সফরকারিদের দরকার ছিল ২৩ রান। এমন সময়ে ১৯তম ওভারে এসে মাত্র ১ দেন কাটার মাস্টার। তাতেই পাহাড়সমান চাপ গিয়ে পড়ে ড্যান ক্রিশ্চিয়ান আর অ্যালেক্স কারের ওপর।তারা সেই চাপ নিতে পারেননি। ক্রিশ্চিয়ান ১০ বলে ৭ আর কারে ১৫ বলে ২০ রানে অপরাজিত থাকেন। ৬ উইকেট হাতে রেখেই হার মানে অস্ট্রেলিয়া। ২০ ওভার শেষে তোলে ৪ উইকেটে ১১৭ রান।

রান তাড়ায় নেমে অবশ্য শুরুতেই ধাক্কা খেয়েছিল অসিরা। ওপেন করতে নেমে অসি অধিনায়ক ম্যাথু ওয়েড (১) দলীয় ৮ রানের মাথায় সাজঘরে ফেরত যান। নাসুম আহমেদকে পুল করতে গিয়ে শর্ট ফাইন লেগে শরিফুল ইসলামের ক্যাচ হন তিনি।তবে দ্বিতীয় উইকেটে পঞ্চাশোর্ধ্ব জুটি গড়ে তুলেন ম্যাকডরমট আর শন মার্শ। তেড়েফুরে না মেরে ওয়ানডের মতো দেখেশুনে দলকে এগিয়ে নিতে থাকেন তারা। ১২তম ওভারে এসে জুটিটি ভাঙতে পারতো।

কিন্তু মোস্তাফিজুর রহমানের ওভারের প্রথম বলে ম্যাকডরমটের সহজ ক্যাচ লংলেগ বাউন্ডারিতে ফেলে দেন শরিফুল। তবে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। ৪১ বলে ৩৫ রান করা ম্যাকডরমটকে পরের ওভারেই বোল্ড করে দেন সাকিব।তার পরের ওভারে আরও এক উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। এবার শরিফুলের ওভারের প্রথম বলটিতেই লেগ সাইডে তুলতে গিয়ে মিডঅনে শামীম পাটোয়ারীর ক্যাচ হন ময়েচেস হেনড্রিকস (২)।

অস্ট্রেলিয়ার ওপর রানের চাপ বাড়তে থাকে। বাংলাদেশি বোলাররাও চেপে ধরেন সাধ্যমতো। শেষ তিন ওভারে দরকার ছিল ৩৪ রান। সেই চাপের সুযোগটা নেন শরিফুল।১৮তম ওভারের প্রথম বলে লংঅফে তুলে মারতে গিয়ে নাইম শেখের ক্যাচ হন মার্শ (৪৭ বলে ৫১)। সেট ব্যাটসম্যান আউট হওয়ার পরই কঠিন উইকেটে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়ে অসিরা। পরের কাজটা সেরেছেন মোস্তাফিজ দুর্দান্ত এক ওভারে, শেষে তুলির আচড় দিয়েছেন মাহেদি।

এর আগে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ক্যাপ্টেনস নকে ভর করে ধীরগতির পিচে ৯ উইকেটে ১২৭ রান তুলে বাংলাদেশ। দুই ওভার পার হতেই উইকেটে আসা মাহমুদউল্লাহ দায়িত্ব নিয়ে ইনিংসের প্রায় শেষ পর্যন্ত দলকে নিয়ে গেছেন। ৫৩ বলে ৪ বাউন্ডারিতে তিনি করেন ৫২ রান।

এদিন অস্ট্রেলিয়া মাঠে নেমেছিল একাদশে তিন পরিবর্তন নিয়ে, কৌশলেও ছিল স্পষ্ট পরিবর্তন। ওপেনিংয়েই স্পিনার এনেছিলেন অধিনায়ক ওয়েড। টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই অসি বোলারদের তোপের মুখে পড়েছিল টাইগাররা। ৩ রানের মধ্যে তারা হারিয়ে বসে দুই ওপেনার সৌম্য সরকার আর নাইম শেখকে।

ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই প্রথম ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। জশ হ্যাজলেউডের ওভারের শেষ বলের সুইং বুঝতে না পেরে ব্যাট ধরে উইকেটের পেছনে ক্যাচ হন নাইম (১)।পরের ওভারে বল হাতে নিয়েই সাফল্য পান অ্যাডাম জাম্পা। প্রথম বলেই অসি লেগস্পিনারকে সুইপ করতে গিয়ে মিস করেন সৌম্য। এলবিডব্লিউয়ের আবেদন হলে আম্পায়ার আঙুল তুলে দেন। রিভিউ নিয়েও লাভ হয়নি। ১১ বলে ২ রান করে সাজঘরে ফিরতে হয় টানা অফফর্মে থাকা সৌম্যকে।

৩ রানে নেই ২ উইকেট। দলের এমন কঠিন বিপদের সময় হাল ধরেন সাকিব আল হাসান আর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। উইকেটে সেট হয়ে রানের গতি বাড়াচ্ছিলেন সাকিব। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ১৫ বছর পূর্তির দিন ১৭ বলে ৪ বাউন্ডারিতে ২৬ রানের ঝড় তুলে ফিরতে হয় বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারকে।ইনিংসের নবম ওভারের প্রথম বলেই অ্যাডাম জাম্পাকে তুলে মারতে চেয়েছিলেন সাকিব। ভেবেছিলেন লংঅফের ওপর দিয়ে বাউন্ডারি পেয়ে যাবেন। কিন্তু দৌড়ে এসে দারুণ এক ক্যাচ নেন অ্যাশটন অ্যাগার। তাতেই মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে সাকিবের ৩৬ বলে ৪৫ রানের জুটিটি ভাঙে।

তবে এরপর আফিফ হোসেন ধ্রুবর সঙ্গে ২৩ বলে ২৯ আরেকটি জুটি গড়েন মাহমুদউল্লাহ। এই জুটিতেও মাহমুদউল্লাহ ছিলেন ধীর, চালিয়ে খেলেছেন আফিফ।ঝড়ো গতিতে এগিয়ে যাওয়া আফিফ ভুল করে এক রান নিতে গিয়ে পড়েছেন রানআউটে। কভারে ঠেলে দিয়েই দৌড় দিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু জায়গামতো পৌঁছতে পারেননি।সরাসরি থ্রোতে ননস্ট্রাইকের উইকেট ভেঙে দেন অ্যালেক্স কারে। ১৩ বলে একটি করে চার-ছক্কায় আফিফের ১৯ রানের ইনিংসটি থেমেছে তাতেই।

এরপর শামীম হোসেন পাটোয়ারীও (৮ বলে ৩) হ্যাজলেউডকে ক্রস খেলতে গিয়ে মিডউইকেটে হয়েছেন ক্যাচ।নুরুল হাসান সোহান শুরুটা করেছিলেন দারুণ। নিজের মুখোমুখি তৃতীয় বলেই লংঅনের ওপর দিয়ে বিশাল ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন। তার ইনিংসটিও থেমেছে দুর্ভাগ্যজনক রানআউটে।এই আউটে অবশ্য দায় মাহমুদউল্লাহর। কভারে ঠেলে দিয়েই টাইগার অধিনায়ক রানের জন্য কল দেন, কিন্তু সোহান (৫ বলে ১১) পৌঁছার আগেই সরাসরি থ্রোতে উইকেট ভেঙে দেন হেনড্রিকস।

মাহমুদউল্লাহ একটা প্রান্ত তবু ধরে ছিলেন। দেখেশুনে খেলে হাফসেঞ্চুরিও তুলে নেন। শেষ পর্যন্ত ইনিংসের ২ বল বাকি থাকতে নাথান এলিসের বলে বোল্ড হন ৫২ করে। পরের দুই বলে আরও দুই উইকেট নিয়ে অভিষেকেই হ্যাটট্রিক পূরণ করেন অসি পেসার।  ৩ ওভারে ২৯ রান দিয়েছিলেন তিনি। ড্যান ক্রিস্টিয়ানের বদলে তাকেই শেষ ওভারে আনা হয়। শেষ ওভারের ও চতুর্থ বলে মাহমুদউল্লাহকে বোল্ড করেন নাথান। পরের দুই বলে ক্যাচ আউট হয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান ও মেহেদী হাসান। মোস্তাফিজ আউট হন ডিপ মিডউইকেটে ও মেহেদী ক্যাচ দেন স্কয়ার লেগে। ৩৪ রানে ৩ উইকেট নিয়ে বোলিং শেষ করেন এলিস।

 এছাড়া অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের মধ্যে জস হ্যাজেলউড ৪ ওভারে মাত্র ১৬ রানে নিয়েছেন ২ উইকেট। ২টি উইকেট শিকার অ্যাডাম জাম্পার। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে শেষ পর্যন্ত রেকর্ড গড়েই অস্ট্রেলিয়াকে বাংলাদেশ হারিয়েছে ১০ রানে। আর এই জয়ে পাঁচ টি-টোয়েন্টির সিরিজ বাংলাদেশ নিশ্চিত করে ফেলল দুই ম্যাচ বাকি থাকতেই। আগামীকাল ও ৯ আগস্টের শেষ দুটি ম্যাচ এখন শুধুই আনুষ্ঠানিকতা।

এ জাতীয় আরও সংবাদ

Back to top button