আত্ম দৈনতা…

সামাজিক মাধ্যমে একজন বোকাসোকা বা বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি বা অনলাইনে জিনিসপত্র লাইভ সেল করা কেউ তার নিজ পেইজে নিজের ভালোলাগা পরিপক্ক বা অপরিপক্ক, ভালো-মন্দ বা বাহ্যিকভাবে হাস্যকর কোন পোস্ট করলে তাকে ট্রোল করতে শুরু করে দেই আমরা। অনেকেই করছি এটা।

বয়স্ক মানুষকে ভাঁড়ামীতে পেয়েছে,বোকা হলে ব্যাটা একটা হাবারাম,আর অনলাইনে প্রডাক্ট বিক্রি করা মেয়ে হলে তো কথাই নাই।কি বলবে না সেটাই খুজে পায়না যেন। অথচ অন্যের মনে আঘাত না দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু লেখা,বলা বা কোন বিজনেস করাটা যে একান্তই নিজের স্বাধীনতার ব্যপার,সেখানে যে অযাচিত অন্যায় হস্তক্ষেপ করতে নেই তা আমাদের কে শেখাবে!

ট্রোল বানানো সেই মানুষটার মানসিক দিক না ভেবেই আমরা এক অসুস্থ খেলা শেয়ার করার উৎসব শুরু করে দেই।একবারো ভেবে দেখছি না,বেচারার কর্মটি আপনার চোখে যতখানি হাস্যকর লাগছে তা তাঁর চোখে হয়তো দারুন ও অনবদ্য কিছু একটা।

আচ্ছা ধরুন,আমার আবৃত্তির কন্ঠ ভালো না,বেশ কর্কশ কন্ঠ।কিন্তু আমি আবৃত্তি শুনতে ভালোবাসি।একদিন শখ করে আমার ওয়ালে নিজের একটি আবৃত্তি পোস্ট করলাম।খুবই খারাপ লাগলো আপনার শুনতে।তাই বলে আপনি কি আমাকে ট্রোল করতে পারেন?কিংবা ধরুন, আমার বয়স ৬৫ বছর।আমি আমার পারিবারিক ঘরোয়া কোন একটা অনুষ্ঠানে নাচলাম,গাইলাম। এটা কি আমার ব্যক্তিগত ভালো লাগা ব্যাপার নয়?এটাকে কেউ একজন ভিডিও করে ফেসবুকে ছেড়ে দিল।এখন তাই বলে কি আপনি জাত গেলো জাত গেলো বলে এটাকে ট্রোল বানাতে উঠেপড়ে লেগে যাবেন?

কিংবা কোন একটা মেয়ে অনলাইনে নানা আইটেমের জিনিসপত্র বিক্রির বিজনেস করছেন।একটা মেয়ে অনলাইনে এই বিজনেস করে তার মা-বাবা বা পরিবারকে সহায়তা করছেন,ছোট ভাই-বোনদের পড়ালেখার খরচ দিচ্ছেন।তাঁর এই কাজটি আপনার চোখে কি একটুও সম্মানজনক কাজ মনে হয় না?
অথচ আপনি তার লাইভে গিয়ে কমেণ্টে তাকে খুব বাজে ভাষায় যা মনে আসে তাই লিখতে শুরু করলেন,মান-অপমান করা কথা বললেন।বেচারার বিজনেসের শক্তি এতে কি সাভাবিক থাকবে?

ইদানিং আবার ড. মাহফুজুর রহমান সাহেবকে নিয়ে আরেক ট্রোলিং শুরু হয়েছে। জনাব মাহফুজুর রহমান কেমন মানসিকতার বা কোন লেভেলের মানুষ তার কোন বালাই না রেখেই তাকে নিয়ে ট্রোল শুরু হয়ে গেছে।জনাব মাহফুজ সাহেব তাঁর নিজ মালিকানাধীন টিভিতে প্রতি ইদেই গান করেন।এটা তার নিকট অন্যরকম ভালো লাগা একটি কাজ হতে পারে।আপনার ভালো না লাগলে আপনি তার টিভি দেখাটাই প্রয়োজনে বন্ধ করে দিন।কিন্তু আপনি তাকে সামাজিকভাবে বুইড়ার ভীমরতি,বা জোঁকার,ছোকরামো,লুইচ্চা এগুলো বলতে পারেন কি? তাঁর মতো বয়োজ্যেষ্ঠ একজন মানুষের কি কোন আনন্দ করার অধিকারটুকুও আপনার কাছে নেই?আপনি এমন মানুষ হতে পারেন কি? ভারতে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষদের এরকম কষ্ট বোঝাতেই “বাগবান” নামে একটি চলচিত্র নির্মিত হয়েছে।পারলে দেখে নিবেন।

একবার ভেবে দেখেছেন,আপনি কে?আপনার কি অধিকার আছে এই রকম মানুষগুলোকে খারাপভাবে ট্রোল করার? এরা কি কেউ চুরি,ধর্ষণ,খুন বা ডাকাতির মতো অন্যায় কাজ করেছেন?একবার ভেবে দেখেছেন,তারা কি ধরনের অপরাধ করে ফেলেছে আপনার কাছে যে, তাদেরকে এভাবে ট্রোল করতে আপনি এতো সুখ পান? ফেসবুক,ইউটিউবে কত কিই তো জানার আছে,দেখার আছে।সেগুলো রেখে কেন অন্য নিরাপরাধ মানুষকে নিয়ে আপনার এই বুনো উল্লাস?

কিছু ভালো না লাগলে এড়িয়ে যেতে পারেন।অন্যকে ট্রোল করে নিজেকে কি হিসেবে প্রকাশ করতে চাচ্ছেন? আপনি তার থেকে বেশি জ্ঞানী,আপনি তার থেকে বেশি বুদ্ধি রাখেন বা তার থেকে আপনি সেরা জীব।

তাই কি…?

কোন বয়োজ্যেষ্ঠ বা অপরিপক্ক বা আপনার দৃষ্টিতে বোকা ধরনের কেউ কিছু করলেই তার বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তে হবে? আপনাকে এই লাইসেন্স কে দিয়েছে?

যারা কেবল নিজের ভালো লাগার জন্যই কোন পোস্ট বা ভিডিও করেন, হতে পারে তা একেবারে মানহীন কিছু কিন্তু স্বল্প ক’টা দিনের জীবনে, তাঁদের সরল আনন্দ উপভোগ করা থেকে তো তাদেরকে আমরা বঞ্চিত করার অধিকার রাখিনা,তাই না?যারা তাদের নিরুৎসাহিত করছি ও সমাজের চোখে হেয় বা পাগল করতে ট্রোল করছি আমরা তারা কোন ধাঁচের মানুষ ভেবেছেন?

এবার একটু শক্ত ভাষাতেই বলতে হচ্ছে, যারা নিরীহ এই মানুষগুলির সাথে এমন করে,সখের বসে হলেও একবার তাদের আইডিগুলোতে ঢু মেরে চেক করে দেখতে পারেন।দেখবেন,হয় তাদের নিজেদের কোন আয় রোজগারের পথ নেই, অথবা তারা অন্যের ঘাড়ে চেপে দুনিয়ায় বেঁচে থাকা অকর্মা টাইপের মানুষজনই বেশি সংখ্যক। রাস্তায়,ট্রেনে-ঘাটে ছুটে চলা ব্যস্ত মানুষদের পকেটের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে জীবন পার করে দেয়া মানুষজনদের বেশিরভাগ এরাই।এদের উল্লেখ করবার মতো তেমন ভালো কোন সামাজিক পরিচয় আছে বলে আমার বিশ্বাস হয় না।
এরা অন্যের ভালো কোন পোস্টেও বাজে কমেন্ট করতে বা কোন সাদাসিধা মানুষকে নিয় ট্রোল করতে অথবা অন্যের ব্যক্তিগত জীবনের কোন ছোটখাটো ভুলবশত লজ্জার কথা বুক উচু করে সকলের কাছে প্রকাশ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বা লজ্জা পায়না…

সমাজের এই শ্রেণির মানুষগুলোর অন্যকে ছোট করার এই ধারাটি চিরদিনই কি চলতেই থাকবে…? আমরাই চেইঞ্জ না করলে দেশটা আর কে কবে চেইঞ্জ করবে?

পুনশ্চঃ আমরা অনেকেই হয়তো মনের অজান্তেই ঝোকের বসে অন্যের দেখাদেখি অনেক কিছুই শেয়ার করে ফেলি।এখন এটা পড়ে হয়তো মনে কষ্ট লাগতে পারে কারো কারো।কারন,ঝোকের বসে কিছু শেয়ার করলেও মনের দিক দিয়ে সবাই একরকম না এটাও ঠিক।এজন্য আমার এই কথাগুলোতে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।তবে একই সাথে অনুরোধ করছি, আমরা যেন কোন কিছু ভাল করে না দেখে, না বুঝে কেবল হুজুগের বসেই কোন কিছু শেয়ার না করি।কারো পোস্টে খারাপ বা বাজে কমেন্ট না করে ফেলি।সুন্দর করেও অনেক শক্ত কথা বলা যায়,কোন নেগেটিভ পোস্ট দেখলে আমরা যেন সেভাবেই ভদ্রভাবে লেখায় অভ্যস্ত হই।

এম আই প্রধান

এ জাতীয় আরও সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button