আমরা কি একা এই মহাবিশ্বে? পর্ব ২

ফার্মি প্যারাডক্স

পদার্থবিদ এনরিকো ফার্মি সর্বপ্রথম এই সমস্যাটি আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেন। তিনি উপলব্ধি করেন আমাদের সৌরজগৎ এই মহাবিশ্বের অন্যান্য স্থানের তুলনায় অপেক্ষাকৃত নবীন। মহাবিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে সভ্যতা গড়ে উঠলে এবং তারা রকেটের প্রযুক্তি আয়ত্ব করতে পারলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই (এক কোটি বছরের মধ্যে) সমগ্র গ্যালাক্সিতে ছড়িয়ে পড়ার কথা। আমাদের পৃথিবীর সভ্যতার বিকাশের দিকেই দেখুন। পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব হয়েছে ৩৫০ কোটি বছর আগে আর মানুষের উদ্ভব প্রায় দেড় লাখ বছর আগে। আমাদের প্রযুক্তির ইতিহাস বড়জোর দেড়শ’ বছরের মতো। এই দেড়শ’ বছরেই মানুষ কত কিছু অর্জন করে ফেলেছে প্রযুক্তির দিক দিয়ে যা আগের ৩৫০ কোটি বছরের তুলনায় রীতিমত অকল্পনীয় গতির। প্রযুক্তির অগ্রগতির দিক থেকে সভ্যতাগুলোকে তিন শ্রেনীতে ভাগ করা হয়, যথাক্রমে টাইপ-১, ২ ও ৩ । টাইপ-১ সভ্যতা তার সম্পূর্ণ গ্রহের শক্তির উৎসগুলোকে নিজের কাজে লাগাতে পারে। টাইপ-২ সভ্যতা তাদের নক্ষত্রটির সমগ্র শক্তিকে নিজেদের কাজে ব্যবহার করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, শক্তি সংগ্রহের একটি নমুনা হতে পারে, নক্ষত্রের চারদিকে ঘিরে সৌরপ্যানেল বসিয়ে দেওয়া এবং তার শক্তি সরাসরি নিজেদের গ্রহে স্থানান্তর করা (এ ধরনের একটি শক্তি সংগ্রহের গোলককে নাম দেওয়া হয় ডাইসন গোলক )। আর টাইপ-৩ সভ্যতা হলো সেই সভ্যতা যারা সমগ্র গ্যালাক্সিটির শক্তিকে সংগ্রহ করে নিজেদের কাজে লাগাতে পারে, ফার্মি যেমন ধারনা করেছিলেন। কেমন করে একটি টাইপ-৩ সভ্যতা সমগ্র গ্যালাক্সিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে? একটা উপায় হতে পারে প্রজন্মান্তর মহাকাশযান তৈরি করা। এই মহাকাশযানগুলোকে মূল গ্রহ হতে তৈরি করে চতুর্দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তারপর তারা নিজেরাই বিভিন্ন নক্ষত্র ব্যবস্থায় হাজির হবে এবং সেখানকার গ্রহগুলোকে নিষ্কাশন করে সম্পদ আহরণ করবে এবং নিজেদের মতো আরো অনেকগুলো মহাকাশ যান তৈরি করবে। এভাবে হাজার বছরের ব্যবধানে সমগ্র গ্যালাক্সিটি মহাকাশযানে সয়লাব হয়ে যাবে।

পৃথিবীর সভ্যতার দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় আমরা এখনো আমাদের গ্রহটির সমগ্র শক্তির উৎস কাজে লাগাতে পারিনি, তবে আগামী ২-৩ শ’ বছরের মধ্যে পারব এবং তাই হিসেব অনুযায়ী আমাদের সভ্যতা টাইপ-০.৭৩ এর কাছাকাছি। অর্থাৎ আমরা এখনো সভ্যতার সংজ্ঞার মধ্যে উপনীত হতে পারি নি।

জীবদ্দশায় ফার্মি এই প্যারাডক্স নিয়ে বেশীদূর এগোতে পারেন নি। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৭৫ সালে মাইকেল এইচ. হার্ট এই বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন । এই গবেষণাপত্রে তিনি বেশকিছু যুক্তি তুলে ধরেন। যেমন:

১. মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সিতে কয়েকশ’ কোটি সূর্যের মতো নক্ষত্র রয়েছে।
২. এই নক্ষত্রগুলোর অনেকগুলোকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীর মতো গ্রহের উপস্থিতির বড় সম্ভাবনা আছে। এবং প্রাণের বিকাশ স্বাভাবিক হলে এদের অনেকগুলোতেই ইতিমধ্যে বুদ্ধিমান প্রাণের বিকাশ হয়েছে।
৩. বুদ্ধিমান প্রাণের এই সভ্যতাগুলোর মধ্যে কিছু কিছু আন্তঃনাক্ষত্রিক ভ্রমনের প্রযুক্তি অর্জন করেছে। পৃথিবী এখন এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার পর্যায়ে আছে।
‘৪. খুব ধীর গতিতেও যদি আন্তঃনাক্ষত্রিক ভ্রমনের প্রযুক্তি এগোয় তবুও সমগ্র মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সি দখল করে নিতে কোটি বছরের মতো সময় লাগার কথা।
৫. সর্বোপরি, যেহেতু সূর্যের মতো নক্ষত্রগুলোর একটি বিরাট অংশ শতকোটি বছরের পুরোনো এর ফলে ইতিমধ্যেই গ্যালাক্সির সর্বত্র সভ্যতা ছড়িয়ে যেতে যথেষ্ট পরিমান সময় পেয়ে যাওয়ার কথা।

এই পর্যায়ক্রমিক যুক্তিগুলো অনুসারে মানুষের পৃথিবীতে ইতিমধ্যেই মহাজাগতিক বুদ্ধিমান প্রানীর হানা দেওয়ার কথা।  শুধু যুক্তিই নয়, মহবিশ্বে কতগুলো স্থানে সভ্যতা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে তা নিয়ে রয়েছে একটি সমীকরণ। এর নাম ড্রেক ইকুয়েশন। ১৯৬১ সালে ফ্রাংক ড্রেক এই সমীকরণটি তৈরি করেন। ড্রেক ইকুয়েশনটি হলো,

N= R*

এখানে, N হলো আমাদের গ্যালাক্সিতে গড়ে ওঠা সভ্যতার সংখ্যা, R* = আমাদের গ্যালাক্সিতে নক্ষত্র তৈরির হার, fp = গ্রহ রয়েছে এমন নক্ষত্র ব্যবস্থাগুলোর ভগ্নাংশ, ne = প্রতিটি নক্ষত্রকে আবর্তনরত প্রাণ ধারনে সক্ষম গ্রহের গড় সংখ্যা, f1 = প্রাণ ধারনে সক্ষম গ্রহগুলোর মধ্যে যেগুলোতে প্রানের আবির্ভাব ঘটেছে তার ভগ্নাংশ, fi =প্রাণের আবির্ভাব ঘটা গ্রহগুলোর মধ্যে বুদ্ধিমান প্রাণ তথা সভ্যতা গড়ে ওঠা গ্রহের ভগ্নাংশ, fc =যেসব সভ্যতায় প্রযুক্তি মহাকাশে তাদের সনাক্তকরার উপযোগী সংকেত প্রেরণে সক্ষম তার ভগ্নাংশ আর সবশেষে, L হলো প্রতিটি সভ্যতার সংকেত প্রেরণের সময়ের দৈর্ঘ্য।

ড্রেক ইকুয়েশনের একটি সমস্যা হলো এই সমীকরণে যে রাশিগুলো আছে তার অনেকগুলোই যথাযথভাবে নির্ণয় করা দুঃসাধ্য এবং অনুমান নির্ভর। ড্রেক ইকুয়েশন ব্যবহার করে অনেকেই সম্ভাব্য সভতার সংখ্যা গণনা করতে চেষ্টা করেছেন এবং বলাই বাহুল্য একেকজনের গণনার মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। আশাবাদীরা এই সমীকরণ ব্যবহার করে অনুমান করেছেন মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সিতে সভ্যতা থাকার সম্ভাবনা ১ হাজার হতে ১০ কোটি। আর এদের কয়েকটির মধ্যে যদি পৃথিবীর চেয়ে মাত্র কয়েক কোটি বছর আগেও সভ্যতার উদ্ভব ঘটে থাকে তাহলে এতদিনে তাদের পক্ষে গ্যালাক্সির সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার কথা। তাহলে তারা কোথায়? এর একটি উত্তর হতে পারে ‘মহা ফিল্টার (The Great Filter)’ ।

এ জাতীয় আরও সংবাদ

Back to top button