কবিগুরুর মহা প্রয়ান গেল কাল

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচয় নতুন করে দেওয়ার কিছু নেই। তিনিই একমাত্র কবি যিনি একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দুটি স্বাধীন দেশের জাতীয় সংগীত রচয়িতা। পৃথিবীতে এটি অপূর্ব এবং বিরল দৃষ্টান্ত।

তৎকালীন পূর্ববাংলায় তথা বাংলাদেশে বিশ্বকবির পদচারণা ছিল। তিনি জমিদারি তদারকির জন্য বাংলাদেশের নওগাঁর পতিসর, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও কুষ্টিয়ার শিলাইদহে অবস্থান করেছেন। তাঁর শ্বশুরবাড়ির খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি গ্রামে। কাজেই বাংলাদেশ ভূখণ্ডের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ ছিল ঘনিষ্ঠ।

বাঙালি সুখে-দুঃখে বারবার ফিরে যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছেই। বাঙালির এমন কোনো অনুভূতি নেই, যার প্রকাশ ঘটেনি ক্ষণজন্মা এই বাঙালির সৃজনকর্মে। বিশ্বজুড়ে যখন কভিড-১৯-এর মহামারি চলছে, তখনো প্রাসঙ্গিক রবীন্দ্রনাথ। জীবদ্দশায় তিনি প্লেগ, ম্যালেরিয়া প্রভৃতির বীভৎস রূপ দেখেছেন। প্লেগ সচেতনতায় রাস্তায় নেমেছিলেন। যুক্ত হয়েছিলেন হাসপাতাল নির্মাণকাজে। আর যা লিখেছিলেন তা এখনো প্রাসঙ্গিক। তিনি লিখেছিলেন, ‘ম্যালেরিয়া-প্লেগ-দুর্ভিক্ষ কেবল উপলক্ষমাত্র, তাহারা বাহ্য লক্ষণমাত্র—মূল ব্যাধি দেশের মজ্জার মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে।’ করোনাকালীন পরিস্থিতিতে এবার পালিত হয় বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুবার্ষিকী। গতকাল বৃহস্পতিবার, ২২ শ্রাবণ কবিগুরুর ৮০তম প্রয়াণ দিবস।  কবিগুরুর প্রিয় ঋতু ছিল বর্ষা। অজস্র রচনায় বাংলার বর্ষাকে তিনি অনিন্দ্যসৌন্দর্যে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে প্রিয় ঋতুতেই নির্বাপিত হয়েছিল কবির জীবনপ্রদীপ।

পৃথিবী ছেড়ে না-ফেরার দেশে চলে গেলেও অসামান্য রচনা ও সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে আজও বেঁচে আছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি এখনও দুই বাংলার মানুষের প্রেরণার এক অন্তহীন উৎস। কলকাতার রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে। ১৯১৩ সালে প্রথম বাঙালি এবং এশীয় হিসেবে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল এনেছিলেন তিনি।

১৯৪১ সালের ৬ আগস্ট, বাংলা ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে ৮০ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ পরলোকগমন করেন। প্রবল অনুরাগ ও অকুণ্ঠ শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত রবীন্দ্রনাথ বাঙালির প্রাণের মানুষ। যত দিন যাচ্ছে, রবীন্দ্রদর্শন উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছে মানুষের মননে-মস্তিষ্কে আর জীবনাচারে।

১৮৭৮ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবিকাহিনী’ প্রকাশিত হয়। সেসময় থেকেই কবির লেখা দেশ-বিদেশে প্রকাশিত হতে থাকে। উপন্যাস, নাটক, সংগীত, প্রবন্ধ, চিত্রকলা বা দর্শন— বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে বিচরণ করেননি রবীন্দ্রনাথ। অসাধারণ সৃজনশীলতা, নিবিড় জীবনবোধ ও ভাষার অনন্য প্রকাশভঙ্গি দিয়ে সাহিত্যের সমসাময়িক বিশ্বে তিনি খ্যাতি লাভ করেন। বিশ্বের নানা ভাষায় তার সাহিত্যকর্ম অনূদিত হয়েছে। নানা দেশের পাঠ্যসূচিতে তার লেখা সংযোজিত হয়েছে।

১৯১০ সালে প্রকাশিত হয় তার ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বলা হয়ে থাকে, রবীন্দ্রনাথের লেখার প্রধান উপজীব্য ছিল জীবনানুভুতি যেখানে বাঙালির জাতিসত্তা, আশা-আকঙ্খা-নিরাশার আবেদনগুলো স্পষ্টভাবে ওঠে এসেছে। এটি এমন প্রবলভাবে এসেছে যে তিনিই হয়ে ওঠেছেন বাঙালির জাতিসত্তা ও বোধের এক অপার আধার।

তার প্রকাশিত কবিতার বই ৫২টি, উপন্যাস ১৩টি, ছোটগল্পের বই ৯৫টি, প্রবন্ধ ও গদ্যগ্রন্থ ৩৬টি এবং নাটকের বই ৩৮টি। কবির মৃত্যুর পর ৩৬ খণ্ডে ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া, ১৯ খণ্ডের রয়েছে ‘রবীন্দ্র চিঠিপত্র’।এ সব মৌলিক সৃজনশীলতার বাইরেও কবির প্রতিভার স্ফুরণ রয়েছে। জমিদার পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি জমিদারিও করেছেন। তার প্রজাহিতৈষী মনোভাব সর্বজন বিদিত।

তিনি ১৮৯১ সাল থেকে বাবার আদেশে কুষ্টিয়া, পাবনা, নাটোর ও ওড়িশায় তাদের জমিদারি দেখাশোনা করেন। সেখানকার পৈতৃক ‘কুঠিবাড়িতে’ তিনি অসংখ্য কবিতা ও গান রচনা করেন। পাশাপাশি তিনি ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯০১ সালে কবি কুষ্টিয়ার শিলাইদহ থেকে সপরিবারে বোলপুরে শান্তিনিকেতনে চলে যান। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯২১ সালে গ্রামোন্নয়নের জন্য ‘শ্রীনিকেতন’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিশ্বভারতী’।

বিশ্ব ভ্রমণেও কবি ছিলেন অনন্য। তিনি ১৮৭৮ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত পাঁচটি মহাদেশের ৩০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেন।কবি রচনা করেছেন দুই হাজারের বেশি গান। অধিকাংশ গানের সুরারোপর তারই। ‘গীতবিতান’ তার সমগ্র গানের গ্রন্থ।কবির লেখা ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। ভারতের জাতীয় সংগীতটিও কবির লেখা। কবি তার গান দিয়েও চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন শতকোটি মানুষের হৃদয়ে।

যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি উপলক্ষে দেশের নানা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে অনুষ্ঠানগুলো ভার্চুয়ালি আয়োজন করা হচ্ছে। বিশ্বকবির প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় নানা উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলা একাডেমি অনলাইনে প্রবন্ধপাঠ, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতার ও বেসরকারি টেলিভিশনগুলো এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান ও নাটক প্রচার করছে।

দিবসটি উপলক্ষে কুষ্টিয়ায় নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলেও শিয়ালদহ কুঠিবাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান হচ্ছে না।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক জীবনে সাহিত্যের এমন বিচিত্র এক জগৎ রচনা করেছেন, যা বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্যের আসরে করেছে মহিমান্বিত। বিপুল তাঁর রচনা, বিচিত্র তাঁর বিষয়। তিনি যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই ফলেছে রাশি রাশি সোনা। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, সংগীত, ভ্রমণকাহিনি, চিঠিপত্র, সমালোচনা, চিত্রকলা সমৃদ্ধ হয়েছে তাঁর অজস্র অনন্য সৃষ্টিতে। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তাঁর নোবেলপ্রাপ্তি বাংলা সাহিত্যকে বিরল গৌরব এনে দেয়। শুধু সৃজনশীল সাহিত্য রচনায় নয়, সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা, অর্থনীতি নিয়ে স্বকীয় ভাবনাও তাঁকে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও গণশিক্ষার যে অগ্রযাত্রা আমরা এখন লক্ষ করি, রবীন্দ্রনাথ সেই সময় নওগাঁর পতিসর ও কুষ্টিয়ার শিলাইদহে, পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনে সে ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। গরিব কৃষক প্রজার কল্যাণে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কৃষি সমবায় ব্যাংক। পরে নোবেল পুরস্কারের টাকার একটি অংশও এই ব্যাংকে যোগ করেছিলেন। ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে গিয়ে দেশজ আদর্শ লালিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শান্তিনিকেতন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধারে কবি, নাট্যকার, কথাশিল্পী, চিত্রশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, ছোট গল্পকার ও ভাষাবিদ। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির এমন কোনো দিক নেই যেখানে এই কীর্তিমানের ছোঁয়া পড়েনি। আশি বছরের জীবন সাধনায় বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে বিশেষ মর্যাদার আসনে আসীন করে গিয়েছেন তিনি। কবিতা দিয়ে সাহিত্যচর্চার শুরু এবং শেষ হলেও তার হাতেই বাংলা ভাষায় প্রথম সার্থক ছোট গল্পের সৃষ্টি হয়েছে। তিনিই আবার বাংলা উপন্যাসকে আধুনিক রূপ দেন। শুধু সৃজনশীল সাহিত্য রচনা নয়, অর্থনীতি, সমাজ, রাষ্ট্র নিয়ে তার ভাবনাও তাকে সম্মানের আসনে পৌঁছে দিয়েছে । মানুষের মুক্তির দর্শন ছিল তার চেতনাজুড়ে। রবীন্দ্রনাথই একমাত্র কবি যিনি দুটি দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা। ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে তার গান ও কবিতা আমাদের প্রেরণার উৎস হয়ে হয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর তার রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিকে জাতীয় সংগীতের মর্যাদা দেওয়া হয়। তারই ‘জনগণমন-অধিনায়কও জয় হে’ গানটি ভারতের জাতীয় সংগীত। প্রয়াণ দিবসে দেশে ও দেশের বাইরে বাংলাভাষীরা বিশ্বকবিকে স্মরণ করছে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই অনন্য ব্যক্তিত্ব যাঁর লেখা গান বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে মনোনীত হয়েছে। করোনাকালীন পরিস্থিতির কারণে ২২শে শ্রাবণ উপলক্ষে এবার তেমন কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন নেই। তবে বাঙালি মননের চিরনবীন এই সারথির প্রয়াণ দিবসে ভার্চুয়াল অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করেছে সমন্বয় পরিষদ ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। রবীন্দ্র স্মরণের এই উৎসবে আজ কোনো শিল্পীর কণ্ঠে উৎসারিত হবে হয়তো অমিয় সুরের ধারা, যেখানে ধ্বনিত হবে, ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু বিরহদহন লাগে/তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা…’।

এ জাতীয় আরও সংবাদ

Back to top button