বিজ্ঞানে আধ্যাত্মিকতা কী

Scientific explanation of spirituality বা আধ্যাত্মিকতার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নিয়েই আজকে লেখা।


তো চলুন এবার জেনে নেয়া যাক যে, বিজ্ঞান মতে, আধ্যাত্মিকতা কী জিনিস? আধ্যাত্মিকতা কোনো উদ্ভট জিনিস নয়। বরং, এটি মানব চেতনারই অংশ। আধ্যাত্মিকতাকে মানব চেতনার একটি অভিজ্ঞতামূলক বৈশিষ্ট্য বলা যেতে পারে, যেটি ব্যক্তির মস্তিষ্কের সাথে পরিবেশের বিশেষ ইন্টারেকশনের ফলে সংঘটিত হয়ে থাকে।

আধ্যাত্মিকতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি আকর্ষণীয় প্রত্যাবর্তন করেছে। নতুন নতুন গুরু এবং সাধুরা তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও এসব আধ্যাত্মিকতার প্রবাহ ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করছেন। আধ্যাত্মিকতার lesson গুলো অধিকাংশই ধর্মীয় ঐতিহ্য, যৌগিক দর্শন, ধ্যান এবং সার্বজনীন চেতনার ধারণা থেকে এসেছে। আধ্যাত্মিকতা বিষয়টা এমন যে, নিজের কাজকর্মের উপরে নিজের নিয়ন্ত্রণ অস্বীকার এবং উপেক্ষা করে উচ্চতর কোনো কাল্পনিক শক্তি বা চেতনার উপর তা ছেড়ে দিয়ে একরকম অভ্যন্তরীণ প্রবাহে থাকা।

তো কী ঘটে যখন কেউ এমন প্রবাহে নিজেকে অনুভব করে? এই বিষয়টার ব্যাখ্যা করবো একজন মনোবিজ্ঞানী এবং একজন নিউরোসায়েন্টিস্টের মতামতের আলোকে।

মনোবিজ্ঞানী বলেছেন যে, কেউ যখন তার দৈনন্দিন চিন্তাভাবনায় এবং কাজকর্মে খুব stressed ফিল করে তখন সে আধ্যাত্মিক প্রবাহে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে। তাই এই stressed অবস্থাকে আধ্যাত্মিক প্রবাহের বিপরীত দশা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই সময় আধ্যাত্মিক প্রবাহে ভেসে কেউ উচ্চমাত্রিক কোনো শক্তিকে কল্পনা করতে থাকে। নিজের কাজকর্মের দায়মুক্ত হয়ে নিজেকে উচ্চমাত্রিক কোনো শক্তির কল্পনায় ভাসিয়ে ব্যক্তি এমনসব নিদর্শন খুঁজতে থাকে এবং উপসংহার দাঁড় করাতে থাকে; যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব কিংবা যৌক্তিকতা নেই। এটা মূলত দুশ্চিন্তা, চাপ এবং কাজকর্মের দায়মুক্তি ঘটিয়ে নিজেকে কল্পনায় ভাসিয়ে মুক্ত ও শান্ত রাখার একটা চেষ্টা।

আসলে, মানুষ খুব অসহায় প্রাণী। এই প্রতিযোগিতায় ঘেরা জগতে মানুষ জন্ম থেকেই খুব ভীত অনুভব করে। তখন এই প্রতিযোগিতার জটিলতা থেকে মুক্ত থাকার ভঙ্গিমা হিসেবে ব্যক্তি তার নিজের বাইরের কোনো পরিচর্যাকারী কিংবা মহাশক্তির কাছে নিজেকে আত্মসমর্পণ করে সুরক্ষিত বোধ করে। এটি অন্যের যোগ্যতায় নিজেকে শিথিল ও নিরাপদ অনুভব করার পদ্ধতি।

নিউরোসায়েন্টিস্ট বলেছেন, ধ্যান হলো আমাদের নিজেদের দ্বারাই সৃষ্ট একটি প্রক্রিয়া যেটা দ্বারাই আবার আমাদের চিন্তা প্রভাবিত হয়। বিষয়টা এরকম যে, আপনিই নিজেকে বলছেন যে আপনার জীবনে ভালো কিছু ঘটবে। খারাপ সবকিছু আপনার জীবন থেকে দূরীভূত হয়ে যাবে, এটা বারবার বলতে বলতে আপনার চিন্তাকে প্রভাবিত করছেন। ফলে, সেটা আপনার মধ্যেই আবার একটা আত্মবিশ্বাস কিংবা মানসিক শক্তি যোগাচ্ছে।

আপনি যদি সেই প্রবাহ থেকে সরে যান কিংবা সেই প্রবাহকে আপনি বিশ্বাস না করেন; তাহলে কখনোই তা আপনাকে প্রভাবিত করতে পারবে না।

ধ্যান মানুষকে শান্ত করতে পারে কিছু ক্ষেত্রে, যা তাকে সেই আধ্যাত্মিক প্রবাহে প্রবেশ করতে সহায়তা করে। প্রাত্যহিক জীবনের চিন্তাভাবনা কিংবা বিষণ্ণতা থেকে বেরিয়ে এসে শান্ত অনুভব করা এবং নিজের চিন্তার দ্বারা নিজেকেই শান্ত করার প্রক্রিয়াকে উনি প্যারাডক্সের মতো ধারণা করেছেন। যেখানে আপনার ব্রেইন নিজেই সমস্যা সৃষ্টি করছে এবং তা নিজেই ধ্যানের ভঙ্গিমায় নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।

“আমি নিজেকে মহাবিশ্বের সাথে এক করতে যাচ্ছি” এধরনের কথা বলে নিজেকে শান্ত করার প্রচেষ্টা একটি নিরর্থক প্রক্রিয়া বা কাজ। এটা ঠিক এমন যেন, কেউ আপনাকে শান্ত হতে বলছে আর আপনি সেই ‘কেউ’ কে আপনার আপন স্বত্তা ভেবে নিজেকে শান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন।

এটা স্বাভাবিকভাবেই মানুষ ছেড়ে দেয় যখন দেখে যে, এটা একটা ব্যর্থ প্রক্রিয়া এবং আমাদের দৈনন্দিন কার্য প্রক্রিয়াগুলো এর চেয়েও জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ। নিউরোসায়েন্টিস্ট আরো বলেন যে, এই প্রক্রিয়াটা নিজেকে বড় কিছুর মাঝে আত্মসমর্পণের একটা ব্যর্থ চেষ্টা।

অর্থাৎ, আধ্যাত্মিকতা হলো একটি সাইকোলজিক্যাল হাতিয়ার যেটা দিয়ে মানুষ নিজেকে স্বাভাবিক করতে পারে, প্রবাহে নিতে পারে। কিন্তু প্রত্যেকের ক্ষেত্রে এটা কার্যকরী নয়।

এবার চলুন জেনে নেওয়া যাক যে, বিজ্ঞানীরা মানব মস্তিষ্কে আধ্যাত্মিকতা কীভাবে চিহ্নিত করেন—-

নিউরোসায়েন্টিস্টদের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মানুষ যখন উচ্চমাত্রিক কোনো শক্তির কল্পনা করে আধ্যাত্মিক প্রবাহে ডুব দেয় তখন তার মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু part activate হয়। এসময় parietal cortex অ্যাকটিভেট হয়; যেটা মূলত সংবেদন, স্থানিক অভিযোজন, ভাষা প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য ফাংশনের মধ্যে মনোযোগকে প্রভাবিত করে বলে মনে করা হয়। এক কথায়, একজন মানুষ যখন বৃহত্তর কিছুর (গির্জা, গাছপালা, খেলার স্টেডিয়াম, কাল্পনিক শক্তি, উচ্চমাত্রিক রক্ষাকর্তা) সাথে সংযুক্ত বোধ করে তখন প্রতিবারই তার মস্তিষ্কের একই অঞ্চল অ্যাকটিভেট হয়।

বিজ্ঞানীদের মতে, এধরনের আধ্যাত্মিক প্রবাহের ফলে মস্তিষ্কে সৃষ্ট প্রভাব অন্যান্য সকল ধরনের প্রভাব থেকে আলাদা। এধরনের প্রবাহের সময় বিজ্ঞানীরা মানব মস্তিষ্কের left inferior parietal lobule (IPL) – এর কার্যকলাপ হ্রাস পেতে দেখেছেন। এ থেকে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, IPL আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা উপলব্ধির সময় প্রক্রিয়াকরণ করে।

মস্তিষ্কের এই পরিবর্তনগুলো ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে যে, আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার সময় কীভাবে নিজের এবং অন্যদের মাঝে বাধা কমানো যায় বা দূর করা যায়। তা আরো ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে যে, কীভাবে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার সময় বাহ্যিক চিন্তা থেকে মাইন্ড শান্ত অনুভব করে।

কোয়ান্টাম ফিজিক্স এবং বিজ্ঞানের অন্যান্য discipline – এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরো শক্তভাবে এসব আধ্যাত্মিক ক্রিয়াকলাপ ব্যাখ্যা করা যাবে।

এ জাতীয় আরও সংবাদ

Back to top button