রবি ঠাকুরের যুক্তরাষ্ট্র সফর

১৯১৩ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রে ত্যাগ করার পরই ম্যাকমিলান কোম্পানি রবীন্দ্রনাথের গ্রন্থ লন্ডন ও নিউইয়র্ক থেকে এক সঙ্গে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর কিছুদিন পর রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেলে মার্কিন পত্রিকায় তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। পরের দেড় বছরে রবীন্দ্রনাথের সাতটি বই যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত হয়। আসলে রবীন্দ্রনাথের সৌম্য শান্ত মূর্তি, বেশভূষা সবকিছু মিলিয়েই বিদেশিদের কাছে তাঁকে ভিন্ন মনে হয়েছে। কারও কারও কাছে তিনি রহস্যময় কবি, কারও সাধু, আবার কারও কাছে তিনি কবির মতোই দেখতে।

১৯১৬ সালের সেপ্টেম্বরে আবার যুক্তরাষ্ট্রে যান রবীন্দ্রনাথ। উদ্দেশ্য কিছুটা বৈষয়িক। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কারণে সে দেশে তিনি তখন সুপরিচিত। সেই সুযোগে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের জন্য মার্কিন মুলুক থেকে অর্থ উপার্জনের কথা ভাবলেন। নিউইয়র্কের একটি সংস্থা তাঁকে পুরো দেশে মোট ৪০টি ভাষণ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। প্রতি বক্তৃতার জন্য ৫০০ ডলার দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তাঁর ওই সব বক্তৃতা ‘ন্যাশনালিজম ও পারসোনালিটি’ বইয়ে আছে। নিউইয়র্কে দেওয়া ভাষণ সম্পর্কে একটি সাময়িকী লিখেছিল—‘the lecture was one of the most remarkable one, from many standpoints, ever heard in New york ’।

যুক্তরাষ্ট্রে রবীন্দ্রনাথের তৃতীয় সফর ছিল ১৯২০ সালে। তবে এই সফর তাঁর জন্য খুব সুখকর ছিল না। প্রথমত, রবীন্দ্রনাথের নাইট উপাধি প্রত্যাখ্যানকে মার্কিন সরকার খুব ভালো ভাবে মেনে নিতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, জার্মানির সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত করে তাঁকে ব্রিটিশবিরোধী হিসেবে তাঁরা চিহ্নিত করেছিলেন। এই দুই কারণে গত সফরের মতো রবীন্দ্রনাথ আর বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ পাননি। এরপরই হঠাৎ মার্কিন পত্র-পত্রিকা রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে খুব নির্লিপ্ত হয়ে পড়ে। আট বছরের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের মাত্র দুটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয় যুক্তরাষ্ট্র থেকে। পত্র-পত্রিকাতেও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে লেখা কম চোখে পড়ে। এমনকি রবীন্দ্রনাথের দক্ষিণ আমেরিকায় যাত্রার কথাও আর প্রকাশিত হয় না। ১৯২৯ সালে রবীন্দ্রনাথ কানাডায় ‘National Council of Education’ এ ভারতের প্রতিনিধি হয়ে সফর করেন।

এর পরের বছর ১৯৩০ সালে আবার নিউইয়র্কে যান কবি। সেখানে একটি Tagore Reception Committee তৈরি হয়। সেখানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাবেশ হয়। সে সময় রবীন্দ্রনাথ নিজের আঁকা কিছু ছবি নিয়ে গিয়েছিলেন। বুদ্ধদেব বসু ‘Tagore in Translation’ প্রবন্ধে দুঃখ করে বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের এত বড় প্রতিভা শুধু অনুবাদের অভাবে বিশ্ববাসীর কাছে অপরিচিত থেকে গেছে। এমনকি রবীন্দ্রনাথ কোন ভাষায় কবিতা লিখতেন, সে সম্পর্কেও অনেকের ধারণা নেই।

অনুবাদের দায়িত্ব রবীন্দ্রনাথ নিজেই প্রথমে হাতে নিয়েছিলেন গীতাঞ্জলি অনুবাদ করে। তাঁর সেই ইংরেজি সে যুগের ইংরেজি ভাষাভাষীদের মুগ্ধ করেছিল। কিন্তু এ উচ্ছ্বাস বেশি দিন থাকেনি। লস অ্যাঞ্জেলেসের টাইমস পত্রিকা সে সময় লিখেছিল, নোবেল কমিটি একজন হিন্দুকে, যার নাম কম লোকেই উচ্চারণ করতে পারে, যার রচনার মান সম্পর্কে অনেকেই সন্দিহান, তাঁকে নোবেল পুরস্কার দিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার লেখকদের নিরুৎসাহিত করেছে।

স্বভাবত প্রশ্ন জাগে এই নির্লিপ্ততার কারণ কী? রবীন্দ্রনাথ মার্কিন সাহিত্য মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছিলেন গীতাঞ্জলি নিয়ে। কিন্তু তিনি সে দেশে যা নিয়ে বেশি আলোচনা করেছেন তা হলো জাতীয়তাবাদ, ধর্ম ইত্যাদি। বস্তুত রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী প্রতিভার সঙ্গে পশ্চিম দেশের পরিচয় সীমিত। তাঁর কবিতার বিশাল ভান্ডারের মধ্যে মুষ্টিমেয় ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। পরবর্তীতে অবশ্য বব ডিলনের কাব্য সংগীতে এবং মায়া অ্যাঞ্জেলোর কবিতায় রবীন্দ্র প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এমনকি তাঁর নাটকগুলোও পাঠের উপযোগী বলে মনে করা হয়েছে।

বাংলা ছোটগল্পের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের দান সম্পর্কে বাঙালির কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ইংরেজিতে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প নিয়ে আলোচনা কমই হয়েছে। আসলে রবীন্দ্রনাথ বাংলার যে ছবি তাঁর ছোটগল্পে তুলে ধরেছেন, তার সঙ্গে পশ্চিমা দেশের পরিচয় সামান্য। এ কারণে মার্কিন মুলুকে তাঁর ছোটগল্পের বিষয় সমস্যা, সমাজ, অনুভূতি সবকিছুই অপরিচিত থেকে গেছে।

উপন্যাসের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথের খুব বেশি উপন্যাস ইংরেজিতে অনূদিত হয়নি। কাজেই সবকিছু মিলিয়ে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা ঠিক উপযুক্ত মর্যাদা লাভ করতে পারেনি। এর পেছনে তিনটি কারণ বলা যেতে পারে। প্রথম কারণ কিছুটা রাজনৈতিক। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সে দেশের যখন পরিচয় তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলে। সে সময়ে রবীন্দ্রনাথের মতবাদ, তাঁর নাইট উপাধি প্রত্যাখ্যান ইত্যাদি আচরণ মার্কিনরা ভুল বুঝে তাঁকে জার্মান দলভুক্ত মনে করেছে। সে কারণেই রবীন্দ্রনাথকে ঠিক সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। এই আচরণের ফলে রবীন্দ্রনাথও কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়েছিলেন। ফলে ব্যবধানটা কিছুটা প্রশস্ত হয়ে গেছে। দ্বিতীয় কারণটি সাংস্কৃতিক ব্যবধান। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক ব্যবধানের ফলে প্রাচ্যের সমস্যা, তার সুখ-দুঃখ বেদনার ধারার সঙ্গে পাশ্চাত্য দেশ তেমন পরিচিত নয়। সে কারণে তাঁরা নাটক-উপন্যাসের রস উপভোগ করতে পারেনি।

তৃতীয় কারণটি হলো অনুবাদের সমস্যা। একদিকে যেমন ইংরেজির মানের প্রশ্ন উঠেছে তেমনি অন্যদিকে দেখা যায়, রবীন্দ্র ভান্ডারের বিশাল পরিধির সামান্যই বিদেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত ‘শতবার্ষিকী বৎসরের রবীন্দ্রচর্চা’ প্রবন্ধে বলেছেন, আমাদের প্রিয় কবি সম্পর্কে তেমন চর্চা করতে পারিনি। এমনকি রবীন্দ্রনাথের পুরো ইংরেজি রচনার একটি সংকলন এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। সেই সঙ্গে পাওয়া যায় না প্রকৃত এবং পর্যাপ্ত অনুবাদ। ডিমকের ভাষায় রবীন্দ্রনাথ ‘He is an isolated figure, for us, he is not part of a living tradition’।

এ জাতীয় আরও সংবাদ

Back to top button