১০ জনের বাংলাদেশ রুখল ভারতকে

দুর্দান্ত, অবিশ্বাস্য…। ইচ্ছা করলে আরও দু-একটা বিশেষণ যোগ করা যায়। যেভাবে পিছিয়ে পড়েও এক খেলোয়াড় কম নিয়ে ভারতের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়ল বাংলাদেশ, এই ড্রয়ের মাহাত্ম্য তো জয়ের সমানই। ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের প্রবাসী সমর্থকেরা উচ্ছ্বাস করতে করতে মালে জাতীয় স্টেডিয়াম ছাড়লেন। তাঁদের চেহারা দেখেই স্পষ্ট, জয়ের আনন্দ নিয়েই মাঠ ছেড়েছেন তাঁরা।

ইগর স্তিমাচ সংবাদ সম্মেলনে ঢুকলেন মনে হয় আনন্দ-বেদনার মিশ্র অনুভূতি নিয়ে। কেন? ভারতীয় কোচের মুখেই শুনুন তা—‘দুই দলকেই আমি অভিনন্দন জানাতে চাই অসাধারণ একটি ম্যাচ উপহার দেওয়ার জন্য। এটাই উপভোগ্য ফুটবল। বাংলাদেশের প্রশংসা প্রাপ্য, দারণভাবে তারা ম্যাচে ফিরেছে।’ এরপর নিজের দলের কথা বলতে গিয়েই যেন বিষণ্নতায় পেল তাঁকে, ‘ম্যাচটা আমরা জিতে বেরোতে পারিনি, এর জন্য নিজেদের ছাড়া আর কাউকেই দায় দিতে পারি না। ম্যাচটা আরো আগেই শেষ করে দেওয়া উচিত ছিল আমাদের। ১-০-তে এগিয়ে থাকা অবস্থায় ১০ জনের দলের বিপক্ষে এই ফল মানা যায় না।’

বাংলাদেশ কোচ অস্কার ব্রুজোন জয়ের নায়ক ইয়াসিন আরাফাতকে সঙ্গী করে ঢুকলেন ম্যাচের আগে যেমন দৃপ্ত, আত্মবিশ্বাসী চেহারা দেখিয়েছেন, সেই একই রকম দৃঢ় মুখচ্ছবি নিয়ে, ‘বাংলাদেশের ফুটবল মরেনি, এই ম্যাচ শেষে আমি শুধু এটাই বলতে চাই।’ জেমি ডের অধীনে যে দলটি শুধু নিজেদের বাঁচাতে রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে গেছে, তারা একই রকমভাবে জয়ের নেশায় ঝাঁপাতে সত্যিকার অর্থে সেটি নিয়েই একটি অবিশ্বাস তৈরি হয়ে গিয়েছিল এর মধ্যে। তাতে করে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটা হয়েছিল, খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসের জায়গাটা নড়ে গিয়েছিল। ব্রুজোন সেই আত্মবিশ্বাস ফেরানোর কথা বলে গিয়েছিলেন বারবার। কাল ম্যাচে সেই আত্মবিশ্বাসের ঝলকই দেখিয়েছে বাংলাদেশ। ব্রুজোন তাই খুঁটিনাটি বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে জোর দিয়েই বলেছেন, ‘আমি তৃপ্ত, খেলোয়াড়রা যেভাবে খেলেছে তাতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট। পিছিয়ে পড়েও ১০ জনের দল নিয়ে আমরা ব্যবধান আর না বাড়ার খেলা খেলিনি। আমরা একই রকমভাবে জয়ের জন্য ঝাঁপিয়েছি। সত্যি বলতে, দ্বিতীয়ার্ধে কখনো আমার মনেই হয়নি আমরা একজন কম নিয়ে খেলছি।’ এর জন্যই খেলোয়াড়দের বাড়তি চেষ্টা, লড়াই আর পরিশ্রমকেই কৃতিত্ব দিয়েছেন তিনি।

ম্যাচটিকে আলাদাভাবে দুই অর্ধে ভাগ করলে প্রথমার্ধে বাংলাদেশ ও ভারত একটি করে পরিষ্কার সুযোগ পেয়েছে। ছেত্রী গোল করে সে সুযোগ লুফে নিলেও বাংলাদেশ ব্যর্থ। গোল ছাড়াও ম্যাচে পরিষ্কারভাবে বলের দখলে অনেক এগিয়ে ছিল ভারত। প্রথমার্ধের ২০ মিনিট শেষে ৬৮ শতাংশ বলের দখল ছিল ভারতের। প্রথমার্ধ শেষে দল দখলে ভারতের ভাগ ৬৬, বাংলাদেশ ৩৪। তবু ম্যাচের ৩৯ মিনিটে গোলের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। প্রতি–আক্রমণ থেকে মতিন, সাদ ও বিপলুর রসায়নে গোলের সহজ সুযোগ তৈরি করেছিল বাংলাদেশ। সাদের পাসে বক্সের মধ্যে বিপলুর নেওয়া শট রক্ষা করেন গুরপ্রীত সিং।

দ্বিতীয়ার্ধে পুরো প্রেসিং ফুটবল খেলতে শুরু করে ভারত। গোল পরিশোধে বাংলাদেশও ছিল মরিয়া। ৫২ মিনিটে ম্যাচের সবচেয়ে সহজ সুযোগটি নষ্ট করেন রাকিব হোসেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এমন গোল মিস মানা যায় না। সাদ উদ্দিনের কাটব্যাক থেকে গোলমুখে আনমার্কড ছিলেন রাকিব। বলটা পোস্টেই রাখতে পারলেন না এই উইঙ্গার। উল্টো পরের মিনিটেই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়ে বাংলাদেশকে বিপদে ফেলে দেন বিশ্বনাথ ঘোষ। কিন্তু এক খেলোয়াড় কম নিয়েই যেন বেশি ভালো খেলল বাংলাদেশ। অন্তত অস্কার ব্রুজোনের শিষ্যদের খেলা দেখে মনে হয়নি, এক খেলোয়াড় কম নিয়ে খেলছেন তাঁরা।

গোল মিস হয়েছে এ ম্যাচেও। বিপলু সহজ সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি। যে ভয় করা হচ্ছিল, সুনীল ছেত্রী আধা সেকেন্ডের অমনোযোগিতাতেই ব্যবধান গড়ে দিতে পারেন, হয়েছে সেটিও। এর পরও বাংলাদেশ যে হারেনি, গোলও পেয়েছে, সেটি তো ওই লড়াকু মানসিকতাতেই। যে দৃঢ়তার সামনে ভারতীয়রাই একটা সময় নার্ভাস হয়ে পড়েছেন। স্তিমাচ তা নিয়ে হতাশা লুকাননি, ‘অযথাই আমাদের খেলোয়াড়রা কেন ভুল পাস দিয়েছে, ওদের পায়ে বল দিয়ে দিয়েছে জানি না। প্রতিপক্ষকে এভাবে সুযোগ দিলে তার শাস্তি পেতেই হবে, এটাই স্বাভাবিক। সেটাই আমরা পেয়েছি।’ এই ড্রয়ের পর ৪ পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশ পাঁচ দলের আসরে ফাইনালের পথে এক ধাপ এগিয়েও গেল। ব্রুজোনও চান ইতিবাচক ফুটবলের এই ধারাটা ধরে রেখেই সেই মঞ্চে পা রাখতে, ‘আমরা ফাইনালে খেলার লক্ষ্য নিয়ে এখানে এসেছি। সেই পথে আছি এখনো ভালোভাবেই। তবে প্রতিটি ম্যাচেই এই একই দৃঢ়তা দেখিয়ে যেতে হবে আমাদের।’

স্বাগতিক মালদ্বীপের বিপক্ষে বাংলাদেশের তৃতীয় ম্যাচ। ব্রুজোন সেই ম্যাচ নিয়ে গতকালের ম্যাচ শেষ হওয়ার পরপরই যে ভাবতে শুরু করেছেন, কথায়ও তার প্রমাণ মিলল, ‘মালদ্বীপ একটা ম্যাচ ডে বিশ্রাম নিয়ে পূর্ণ উদ্যম নিয়েই পরের ম্যাচে নামবে, কোনো সন্দেহ নেই। এদিকে আমাদের রাকিবের দুটি হলুদ কার্ড হয়ে গেছে, বিশ্বনাথকে হারালাম। তবে আমাদের আসলে পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই। আমার বিশ্বাস, স্কোয়াডের বাকি যারা আছে তারা এই সুযোগটা কাজে লাগাবে।’ মালদ্বীপ প্রথম ম্যাচ হারায় তাদের পয়েন্টের ঝুলি এখনো শূন্য। জেতার জন্য আলী আশফাকরা মরিয়া থাকবে, কোনো সন্দেহ নেই। তবে দলটি প্রথম ম্যাচে তাদের আক্রমণের শক্তি দেখানোর পাশাপাশি ডিফেন্ডিং দুর্বলতাও দেখিয়েছে। ব্রুজোনও নিশ্চয়ই সেটি মাথায় রেখেছেন। এএফসি কাপেও তাঁর দল বসুন্ধরা কিংস মাজিয়া এফসির সেই দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ঠিক জয় নিয়ে ফিরেছিল। ভারতের বিপক্ষে গতকালের ম্যাচটি হলো আবার কিংস-এটিকে মোহনবাগানের মতো। সে ম্যাচেও ১০ জনের দল হয়ে পড়েও কিংস ড্র নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল। তবে সেদিন কিংসই এগিয়ে গিয়েছিল শুরুতে। কাল বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ে ম্যাচে ফেরাটা অন্য রকম, যার বড় জ্বালানি ওই আত্মবিশ্বাসই।

kalerkantho

এ জাতীয় আরও সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button