আওয়ামী লীগের সভাকবি

কবি নির্মলেন্দু গুণ নিজ মুখেই স্বীকার করে নিয়েছেন তিনি আওয়ানী লীগের কবি। কারণ কবির আবির্ভাবের সাথে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের স্মৃতি জড়িত। বঙ্গবন্ধুর উৎসাহ ও প্রেরণা তাঁকে কবি হতে সাহায্য করেছে। কবি কেন আওয়ামী লীগকে এত ভালবাসেন তার কারণও নেহায়েত ছোট নয়। পাকিস্তান আমলে হিন্দুদের অধিকার নিয়ে বঙ্গবন্ধু যতটুকু সোচ্চার ছিলেন তদ্রূপ অন্য কোন রাজনীতিবিদ ছিলেন না।

তৎকালীন শিক্ষিত হিন্দুরা বুঝতে পেরেছিল যে, একমাত্র বঙ্গবন্ধুকে দিয়েই তাদের যতটুকু রক্ষা। এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশেও হিন্দুরা তাদের অধিকার রক্ষায় আওয়ামী লীগকে যতটুকু নির্ভরশীল মনে করে তার ধারে কাছেও অন্য কোন রাজনৈতিক দল নাই। সেই উপলব্ধি থেকেই কবি আওয়ামী লীগের প্রতি দুর্বল। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সাথে কবির ব্যক্তিগত যোগযোগ ছিল। কবি আওয়ামী লীগকে যা ভালবাসেন তার মূলে বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা নয়। তাই বলে তিনি কখনই বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখাননি। তিনি বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন কাজের সমালোচনা করেছেন। অনেক কবি-সাহিত্যিক বঙ্গবন্ধুর বাকশালে যোগ দিলেও কবি নির্মলেন্দু গুণ তা করেন নি।

আবার বঙ্গবন্ধুকে যখন নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তখন তিনি পাগল প্রায় হয়ে গেছিলেন। লেখালেখি বন্ধ করে দীর্ঘদিন আশ্রমে সময় ব্যয় করেছিলেন। এটা করেছেন কেবল বঙ্গবন্ধুর প্রতি কবির ব্যক্তিগত ভালবাসার কারণে। তিনি যে আওয়ামী লীগকে ভালবাসেন সেটা আপনি আমি সবাই জানি। কিন্তু তারপরেও কেউ যখন আগ বাড়িয়ে কবিকে ‘আওয়ামী লীগের কবি’ বলে সম্বোধন করে তখন নিশ্চয় কবিকে ছোট করার জন্য এরূপ শব্দ ব্যবহার করা হয়। ভাবখানা এরকম যে, তিনি যেহেতু আওয়ামী লীগ করেন তাই তিনি অত ভাল মানের কবি না।

বিশ্বকবি বলে সম্বোধন করলে রবি ঠাকুর যতটুকু খুশি হবেন, নির্মলেন্দু গুণকে আওয়ামী লীগের কবি বললে কবি ততটাই মনঃক্ষুন্ন হবেন। মূল কথা হলো আমরা কোন উদ্দেশ্য নিয়ে তাকে আওয়ামী লীগের কবি বলি। নিশ্চয় কেউ সম্মান দেখানোর জন্য কবিকে ‘আওয়ামী লীগের সভাকবি’ বলে না। যারা তাঁকে আওয়ামী লীগের কবি বলে তাদের মূল মাথা ব্যথা আওয়ামী লীগকে নিয়ে, কবিকে নিয়ে নয়। তারা রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগকে পছন্দ করে না, আর কবি আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করে- এজন্যই যত মাথা ব্যথা। কবি হয়ত সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী সরকারের কাজের সমালোচনা করেন নাই। কিন্তু কোন কবিই প্রতিবাদ করে উল্টাই ফেলছেন??? কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপি সমর্থিত সাদা দলের হয়ে নির্বাচন করেছিলেন।

তাই বলে আওয়ামী লীগের লোকজন এসে তাকে “বিএনপি’র সাহিত্যিক” বলে নাই। বরং হুমায়ূন আহমেদ যখন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন তখন শেখ হাসিনা তাঁর চিকিৎসার জন্য অর্থ সহায়তা প্রদান করেছেন। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেন্দ্রীয়-আইন সভার সভ্য হবার জন্য নির্বাচন করেছিলেন। আবুল মনসুর আহমদ রাজনীতিবিদ ছিলেন, অথচ আমরা তাকে সাহিত্যিক হিসেবেই বেশি জানি। সুতরাং শিল্প সাহিত্যিকদের জন্য সরাসরি রাজনীতিতে সংযুক্ত হওয়া দোষের কিছু না। কবি নির্মলেন্দু গুণের সাথে আওয়ামী লীগের সুসম্পর্ক তার মানে এই নয় যে তিনি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের বিরোধী। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণেই আওয়ামী লীগকে তিনি ভালবাসেন; বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক কবিতা রচনা করেছেন। তিনি কোন দল কিংবা ধর্মের কবি নন, তিনি মানবতার কবি, সকল দল ও ধর্মের কবি।

কিন্তু আওয়ামী লীগ কি কবিকে তাঁর যথাযথ মর্যাদা দিতে পেরেছে? বাংলাদেশের কোন সরকারই শিল্প-সাহিত্যকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের মেয়ের সাথে খেলাধূলা করলেন, সাকিবের বাড়িতে নিজ হাতে রান্না করা খাবার পাঠালেন, মমতাজকে পার্লামেন্টে যাওয়ার সুযোগ দিলেন। কবি নির্মলেন্দু গুণের প্রতি এমন কি করেছেন তা আমার জানা নাই।

এবার বাংলা একাডেমি কর্তৃক আয়োজিত লিট ফেস্টে দেশ-বিদেশ থেকে অনেক সাহিত্যিক অংশগ্রহণ করলেও কবি নির্মলেন্দু গুণকে নিমন্ত্রণ দেয়া হয়নি। আগে পরে কত কবিতা পাঠ করেছি তবু কবিতা পাঠের প্রতি তেমন আগ্রহ তৈরি হয়নি। কিন্তু নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি যেভাবে আমাদের হলো’ কবিতাটি পাঠ করার পরে মনে হল কবিতার ভিতরে রস আছে। এই কবিতাটি প্রথম সপ্তাহে অন্তন ত্রিশ বার পাঠ করেছি। তারপর থেকে কবিতা পাঠ করে তৃপ্তি পাচ্ছি। কবি হয়ত রাগ করেই নিজেকে আওয়ামী লীগের কবি বলে স্বীকার করেছেন। কিন্তু তাঁর মত একজন শিল্পীর প্রতি আমাদের যথেষ্ট শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত। তথ্যসূত্র: ১. মুজিব সমগ্র, নির্মলেন্দু গুণ। ২. দেয়াল, হুমায়ূন আহমেদ। ৩. বল পয়েন্ট, হুমায়ূন আহমেদ। ৪. ঠাকুরবাড়ীর আঙিনায়, জসীম উদ্দীন। ৫. আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, আবুল মনসুর আহমদ।

তালহা মুহাম্মদ শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ঢাবি।

এ জাতীয় আরও সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button